হজ্জ ও কুরবানির মাসে হযরত ইব্রাহিমের (আ) খাস ওজিফা। দ্রুত অর্থ সম্পদ ভাগ্যের উন্নতি হবে
হজ্জ ও কুরবানির মাসে হযরত ইব্রাহিমের (আ) খাস ওজিফা। দ্রুত অর্থ সম্পদ ভাগ্যের উন্নতি হবে
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ। প্রিয় দর্শক!
একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন তো—মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোন মানুষের মাথার চুল এবং
দাড়ি পেকে শুভ্র-সাদা হয়েছিল? কিংবা মানুষের লজ্জানিবারণের জন্য প্রথম কে সেলাই করা
পায়জামা পরিধান করা শুরু করেছিলেন? আজ আমরা যাকে আধুনিক সভ্য সমাজ বলি, তার ভেতরের
মার্জিত রূপ, শারীরিক
পরিচ্ছন্নতা এবং আভিজাত্যের প্রথম শিক্ষক কে ছিলেন জানেন?
তিনি এমন এক মহান নবী, যাঁর
পবিত্র রক্ত আর বংশধারা থেকে পৃথিবীতে আগমন করেছেন হাজার হাজার নবী ও রাসূল! যাঁর
ত্যাগ, ভালোবাসা
আর স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের পবিত্র হজ্জ এবং ঈদুল আযহার কুরবানী। শুধু তাই
নয়, ক্বিয়ামতের
সেই ভয়াবহ হাশরের ময়দানে,
কোটি কোটি মানুষের সামনে মহান আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম কাফনের কাপড় বদলে
জান্নাতী পোশাক পরিধান করাবেন এই মহান নবীকে। আর বর্তমানে বরযখ বা কবরের জগতে—আমাদের যে
সমস্ত ছোট ছোট সন্তানরা ইন্তেকাল করে, তাদের পরম স্নেহে পিতা-মাতার মতো
লালন-পালন করছেন তিনি। সুবহানাল্লাহ!
তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন মুসলিম উম্মাহর পিতা, খলিলুল্লাহ
হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। আজ আমরা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবন থেকে পাওয়া এমন
কিছু অলৌকিক ঘটনা, অত্যন্ত
শক্তিশালী দোয়া, আমল
এবং সুন্নতী তরীকার কথা বলব—যা বর্তমান যুগে প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জীবনের জন্য
জানা এবং আমল করা অত্যন্ত জরুরী! আজকের এই ভিডিওতে আপনি এমন কিছু গোপন ও
আশ্চর্যজনক সত্য জানতে পারবেন, যা আপনার ঈমানী চেতনাকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দেবে এবং আপনার
জীবনকে বদলে দেবে ইনশাআল্লাহ। তাই একটি সেকেন্ডও মিস না করে, পুরো
ভিডিওটি একদম শেষ পর্যন্ত দেখার জোরালো অনুরোধ রইলো।
মূল পর্বে যাওয়ার আগে, দেশ ও
প্রবাসের সমস্ত দ্বীনি ভাই-বোনদের হৃদয়ের গভীর থেকে স্বাগত জানাই। এই মুহূর্তে
ইউরোপের বরফঢাকা শহর,
মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি,
কিংবা ভারত ও বাংলাদেশের কোন জেলা বা শহর থেকে আমাদের আজকের এই আমলী আয়োজন
দেখছেন, তা
দয়া করে এখনই কমেন্ট বক্সে লিখে জানান। বিশেষ করে ভারত এবং বাংলাদেশের যে সমস্ত
ভাই-বোনেরা কুরবানীর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আপনারা এবার কে কোন পশু—গরু, মহিষ, নাকি খাসি
দিয়ে কুরবানী করার নিয়ত করেছেন, তা কমেন্ট করে আমাদের সাথে শেয়ার করুন। আপনাদের দেওয়া
কমেন্ট আমাদের পরবর্তী ভিডিও বানাতে দারুণভাবে উৎসাহিত করে।
প্রিয় দর্শক, পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে বড় সূরা,
সূরা বাকারার ১২৪ নম্বর আয়াতে মহান
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
وَإِذِ ابْتَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ ۖ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا
"আর স্মরণ করো,
যখন ইব্রাহিমকে
তাঁর পালনকর্তা কয়েকটি বাণী (আদেশ-নিষেধ) দ্বারা পরীক্ষা করলেন,
অতঃপর সে সেগুলো
পূর্ণ করে দিল। তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা
(ইমাম) মনোনীত করলাম।’"
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশে দুনিয়াতে হাজার হাজার নবী-রাসূল এসেছেন,
তাই তাঁকে ‘আবুল আম্বিয়া’
বা নবীদের পিতা বলা হয়। আজ আমরা হজ্জ এবং
কুরবানীর যে সমস্ত আরকান ও আহকাম পালন করি, তার প্রতিটি মূলত হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর
স্মৃতিবিজড়িত। হাজীরা তাওয়াফ শেষে যে ‘মাকামে ইব্রাহিম’
বা পাথরের সামনে দুই রাকাত নামাজ পড়েন,
সেটিও হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পবিত্র
কদমের চিহ্ন দ্বারা বরকতময় হয়েছে।
শুধু তাই নয়, ক্বিয়ামতের কঠিন দিনে সর্বপ্রথম হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে
জান্নাতী পোশাক পরিধান করানো হবে, এরপর পরিধান করানো হবে আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে। আর বর্তমানে বরযখ বা কবরের জগতে হযরত
ইব্রাহিম (আ.) সকল মুসলমানের ইন্তেকাল করা ছোট ছোট বাচ্চাদের লালন-পালন করে থাকেন।
সুবহানাল্লাহ!
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ব্যাপারে বুখারী ও মুসলিম শরীফে একটি হাদীস আছে যে,
তিনি ৩টি স্থানে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা
বলেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে এগুলোকে মিথ্যা মনে হলেও মূলত তা মিথ্যা ছিল না,
ইসলামী শরীয়তের ভাষায় একে বলা হয় ‘তাওরিয়া’ বা সত্য গোপনের কৌশল। স্থান ৩টি হলো: ১.
তৎকালীন মিশরের বাৎসরিক উৎসবে না যাওয়ার জন্য তিনি বলেছিলেন,
(ইন্নি সাক্বিম) অর্থাৎ
"আমি অসুস্থ"। আসলে তিনি ওই সমস্ত শিরক ও গুণাহের কাজে অংশ নিতে
মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করছিলেন, তাই তিনি নিজেকে অসুস্থ বলেছেন।
২. তিনি কাফেরদের মন্দিরে ঢুকে
মূর্তিগুলো কুঠার দিয়ে ভেঙে, বড় মূর্তির গলায় কুঠারটি ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। যখন জালেম বাদশা
তাঁকে প্রশ্ন করল, তিনি বললেন—"মনে হয় এই বড় মূর্তিটিই এই কাজ
করেছে।" তখন বাদশা রেগে বলল, "মূর্তি কি নড়াচড়া করতে পারে যে অন্য
মূর্তি ভাঙবে?" তখন হযরত ইব্রাহিম (আ.) মোক্ষম জবাব দিয়ে বললেন,
"যে মূর্তি
নড়াচড়া করতে পারে না, নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, তবে সেই মূর্তির পূজা তোমরা কেন করো?"
এটি ছিল মানুষকে সত্য বোঝানোর একটি
ঐশ্বরিক কৌশল। ৩. তিনি যখন তাঁর স্ত্রী সারাকে নিয়ে মিশরে আসছিলেন,
তখন মিশরের বাদশাহ ছিল অত্যন্ত চরিত্রহীন
ও বদমাইশ। সে সুন্দরী পরস্ত্রীদের ওপর জুলুম করত, তবে কারও বোন বা মায়ের সাথে এই কাজ করত
না। তখন হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজের স্ত্রীকে শিখিয়ে দিলেন,
"তোমাকে যখন
জালেম বাদশা প্রশ্ন করবে, তুমি বলবে—আমি তোমার
বোন।" কারণ, মুসলমান হিসেবে আমরা একে অপরের দ্বীনি ভাই-বোন। এটাও ছিল
আত্মরক্ষার একটি কৌশল।
একদা দ্বীন প্রচারের উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী হযরত সারাকে
নিয়ে মিশরের সীমানায় পৌঁছান। বাদশাহর রক্ষীরা হযরত সারাকে দেখে বাদশাহর কাছে তাঁর
রূপ-সৌন্দর্যের প্রশংসা করল এবং বাদশাহর নির্দেশে হযরত সারাকে রাজপ্রাসাদে ধরে
নিয়ে আসা হলো।
প্রাসাদে আনার পর, লম্পট বাদশাহ যখনই কু-মতলবে হযরত সারার দিকে হাত বাড়াল,
তখনই এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল! আল্লাহর কুদরতে
বাদশাহর হাত মুহূর্তের মধ্যে অবশ ও শক্ত হয়ে গেল। সে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে
লাগল। বাদশাহ তখন ভয় পেয়ে বলল, "তুমি আল্লাহর কাছে দুআ করো যেন আমার হাত
ঠিক হয়ে যায়। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।" হযরত সারা আল্লাহর কাছে দুআ
করলেন এবং বাদশাহর হাত সুস্থ হয়ে গেল।
কিন্তু লম্পট বাদশাহ তার স্বভাব সামলাতে পারল না। সুস্থ হয়েই সে দ্বিতীয়বার
আবার হাত বাড়াল। এবার আল্লাহর আযাব আরও কঠিনভাবে তাকে ধরল। তার হাত আগের চেয়েও
শক্তভাবে অবশ হয়ে গেল এবং সে দম আটকে মারা যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়ল। সে আবার
কাকুতি-মিনতি করে বলল, "এবার আমাকে ক্ষমা করো, আল্লাহর কাছে দুআ করো। আমি ওয়াদা করছি,
তোমার গায়ে আর কোনোদিন হাত দেব না।"
হযরত সারা ভাবলেন, সে যদি এভাবে মারা যায় তবে মানুষ ভাববে আমি তাকে হত্যা
করেছি। তাই তিনি আবারও দুআ করলেন এবং বাদশাহ মুক্তি পেল।
পরপর দুইবার আল্লাহর এমন প্রত্যক্ষ কুদরত দেখে অহংকারী বাদশাহ কাঁপতে কাঁপতে
তার রক্ষীদের বলল, "তোমরা আমার কাছে কোনো মানুষ আনোনি,
বরং কোনো এক জ্বিন বা দেও-দানবকে নিয়ে
এসেছ!" ভয়ে এবং সম্মানের খাতিরে বাদশাহ তখন হযরত সারাকে সসম্মানে ছেড়ে দিল
এবং নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তাঁর খিদমতের জন্য মহলের এক রাজকুমারী বা অতি
মর্যাদাসম্পন্ন নারী হযরত হাজেরা (আ.)-কে উপহার হিসেবে দিয়ে দিল। এভাবেই আল্লাহ
তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের ইজ্জত রক্ষা করেছিলেন।
ক্বিয়ামতের দিন যখন সমস্ত মানুষ নবীদের কাছে সুপারিশের জন্য যাবে,
তখন হযরত ইব্রাহিম (আ.) এই ৩টি স্থানে
ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলার কারণে মনে মনে নিজেকে দোষী মনে করবেন। তিনি ভাববেন,
আমি বুঝি আল্লাহর সামনে বান্দার জন্য ভুল
কথা বলে ফেলেছি। তাই তিনি আল্লাহর ভয়ে সেদিন সুপারিশ করা থেকে বিরত থাকবেন। অথচ
উনার সেই কথাগুলো ভুল ছিল না, বরং সময়ের প্রয়োজনে সম্পূর্ণ সঠিক ছিল।
মিশরের বাদশা কর্তৃক উপহার পাওয়া বিবি হাজেরার সাথেই পরবর্তীতে হযরত ইব্রাহিম
(আ.)-এর বিবাহ হয়। আর তাঁর গর্ভেই জন্ম নেন হযরত ইসমাইল (আ.)। সন্তান জন্মের পর
আল্লাহর হুকুমে তাদেরকে বর্তমানে যেখানে কাবা ঘর আছে,
সেই পাহাড়-পর্বত ঘেরা এক জনমানবহীন
মরুভূমিতে সামান্য খাদ্য ও পানীয়সহ রেখে হযরত ইব্রাহিম (আ.) চলে যান। আর সেখান
থেকেই শুরু হয় পবিত্র মক্কা শরীফ আবাদ হওয়ার ইতিহাস।
খাদ্য-পানি যখন শেষ হয়ে গেল এবং মা হাজেরার বুকের দুধ শুকিয়ে গেল,
তখন শিশু ইসমাইলের পানির তৃষ্ণা মেটাতে
মা হাজেরা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ৭ বার দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। আজ লক্ষ লক্ষ হাজী
সাহেবরা হজ্জ ও ওমরায় সাফা-মারওয়ায় চক্কর দিয়ে সেই মা হাজেরার সুন্নত পালন করছেন।
আর যখন এই প্রিয় সন্তান চলাফেরার উপযুক্ত হলো, তখনই হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে নিজের
প্রাণের চেয়ে প্রিয় সন্তানকে কুরবানীর জন্য আদিষ্ট হলেন।
সাহাবীগণ যখন নবীজিকে প্রশ্ন করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! এই কুরবানীর উদ্দেশ্য
কী?" নবীজি (সা.) কিন্তু বলেননি যে শুধু পশু জবেহ করা,
বরং বলেছেন—"এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের
সুন্নত।" এখন প্রশ্ন হলো, ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত কী ছিল?
উনাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানী দিতে। তিনি
প্রথম দিন ১০০টি উট জবেহ করলেন। দ্বিতীয় দিনও একই স্বপ্ন দেখে আরও ১০০টি উট জবেহ
করলেন। কিন্তু যখন তৃতীয় দিনও একই স্বপ্ন দেখলেন, তখন তিনি বুঝলেন আল্লাহ তাঁর উট নয়,
বরং তাঁর বার্ধক্যের একমাত্র কলিজার
টুকরো সন্তান ইসমাইলকে চাচ্ছেন! তিনি নিজের সন্তানকে জবেহ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে
গেলেন। তবে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ ইসমাইলকে জবেহ করাননি,
বরং জান্নাত থেকে দুম্বা পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ মূলত পরীক্ষা করেছিলেন যে, ইব্রাহিম আল্লাহর হুকুম পালনে কতটুকু আন্তরিক। আর তিনি তাতে
শতভাগ পাস করেছেন।
তাহলে আমাদেরও এই কুরবানী থেকে সবচেয়ে বড় ছবক হলো—সব ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মাথাপেতে নেওয়া,
নিজের ভেতরের পশুবৃত্তিকে কোরবানি করা।
কুরবানীর এই প্রকৃত শিক্ষা যদি মুসলিম জাতি আজ গ্রহণ করে,
তাহলে সারা বিশ্বে মুসলমানরা আবার মাথা
উঁচু করে রাজত্ব করতে পারবে।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম যে সমস্ত প্রশংসিত কাজ
করেছিলেন, তা
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক: ১. খতনা (মুসলমানি): তিনিই
প্রথম খতনা করার বিধান চালু করেন এবং নিজের খতনা নিজে করেন।
২.
মেহমানদারী: অতিথি
আপ্যায়ন প্রথার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা করেন। ৩.
নখ ও চুল কাটা: নিয়মিত
নখ কাটা ও গোঁফ ছাঁটার নিয়ম শুরু করেন। ৪.
নাভির নিচের চুল
পরিষ্কার: অপ্রয়োজনীয় চুল কাটার মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতার সূচনা করেন। ৫. বগলের
লোম উপড়ানো: শারীরিক পরিচ্ছন্নতার এই চমৎকার নিয়মটি প্রথম করেন। ৬. মেসওয়াক
ও কুলি: দাঁত মাজা ও কুলি করে মুখ পরিষ্কার করার নিয়ম শুরু করেন। ৭. নাকে
পানি দেওয়া: ওজু ও পবিত্রতার জন্য নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করার আমল
করেন। ৮. পায়খানায় পানি ব্যবহার: শৌচকার্যের
পর পানি দিয়ে উত্তমরূপে পবিত্র হওয়ার প্রথা চালু করেন।
৯.
চুল-দাড়ি সাদা
হওয়া: মানব ইতিহাসে তাঁর চুল-দাড়িই প্রথম সাদা হয়। তিনি যখন
আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে প্রভু! এটি কী?" আল্লাহ বললেন,
"এটি হচ্ছে
মর্যাদার প্রতীক।" তখন তিনি দুআ করলেন, "হে আল্লাহ! আমার এই মর্যাদা আরও বাড়িয়ে
দিন।" ১০. চুলে সিঁথি কাটা: মাথার
চুল মাঝখান দিয়ে সুন্দরভাবে ভাগ করার অভ্যাস শুরু করেন।
১১.
মিম্বরে খুতবা: উঁচু
স্থানে বা মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেওয়ার প্রথা চালু করেন।
১২.
সেলাই করা
পায়জামা: তিনিই সর্বপ্রথম সেলাই করা পায়জামা পরিধান করেছিলেন। ১৩. কোলাকুলি: তিনিই
প্রথম কোলাকোলির বিধান চালু করেছেন, এর আগে সালামের পরিবর্তে 'সিজদায়ে তাহিয়্যা'
বা সম্মানসূচক সেলাই-সিজদা চালু ছিল। ১৪. আটার
রুটি: তিনিই সর্বপ্রথম আটা-ময়দার রুটি তৈরি করেন এবং তা দিয়ে
মেহমানদারী করেন। সুবহানাল্লাহ!
আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে জীবনের পদে পদে পরীক্ষা করেছেন,
যার মধ্যে বড় ৭টি পরীক্ষা হলো: ১. অগ্নিকুণ্ডে
নিক্ষেপ: তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ায় নমরুদের বিশাল অগ্নিকুণ্ডে
জীবন্ত নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরীক্ষা। ২.
স্বদেশ ও
আত্মীয়স্বজন ত্যাগ: আল্লাহর আদেশে নিজের জন্মভূমি ইরাক,
পরিবার ও আত্মীয়স্বজন ছেড়ে হিজরত করার
পরীক্ষা। ৩. মরুভূমিতে স্ত্রী ও সন্তানকে নির্বাসন: নির্জন,
জনমানবহীন মক্কার মরুভূমিতে স্ত্রী
হাজেরা ও দুগ্ধপোষ্য শিশু পুত্র ইসমাইলকে রেখে আসার পরীক্ষা।
৪.
প্রিয় পুত্র
কুরবানি: স্বপ্নের মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ পেয়ে নিজের একমাত্র সন্তান
হযরত ইসমাইল (আ.)-কে নিজ হাতে জবেহ করার পরীক্ষা।
৫.
পারিবারিক
শান্তি বিসর্জন: দুই স্ত্রী (হাজেরা ও সারা)-এর মধ্যকার পারিবারিক পরিস্থিতি
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ও হিকমতের সাথে সামলানোর পরীক্ষা। ৬. মিশরের
অত্যাচারী বাদশাহর মুখোমুখি: জালেম বাদশাহর কবল থেকে নিজের এবং স্ত্রী
হযরত সারার ইজ্জত ও ঈমান রক্ষা করার পরীক্ষা।
৭.
শারীরিক ও
ফিতরাতের কঠিন বিধান পালন: বার্ধক্যের চরম মুহূর্তে আল্লাহর আদেশে
নিজের খতনা করা এবং কঠিন সব শারীরিক পরিচ্ছন্নতার নিয়ম পূর্ণ করার পরীক্ষা।
প্রিয় দর্শক, জীবনে একের পর এক কঠিন পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হওয়ার পর,
হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর দরবারে এমন কিছু ঐতিহাসিক ও পাওয়ারফুল দোয়া
করেছিলেন, যা
মহান আল্লাহর কাছে এতো বেশি পছন্দ হয়েছিল যে তিনি তা পবিত্র কুরআনে চিরদিনের জন্য
অবিনশ্বর করে দিয়েছেন। চলুন আরবীসহ সেই বরকতময় দোয়াগুলো আমরা জেনে নিই এবং নিজেদের
জীবনের জন্য আমল করি:
১. মক্কা নগরীর শান্তি ও রিযিকের
জন্য দোয়া (সূরা বাকারা: ১২৬):
رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ
উচ্চারণ: "রব্বিজ-‘আল হা-যা-
বালাদান আ-মিনাও ওয়ারযুক্ব আহলাহূ মিনাছ ছামারা-তি।" অর্থ: “হে আমার
পালনকর্তা! এই শহরকে (মক্কাকে) শান্তিময় করে দিন এবং এর অধিবাসীদের ফলমূল দ্বারা
জীবিকা দান করুন।”
২. যেকোনো নেক আমল কবুল হওয়ার দোয়া
(সূরা বাকারা: ১২৭): কাবার দেয়াল গাঁথার সময় পিতা-পুত্র এই দোয়া করেছিলেন। আমরাও
যেকোনো আমল, নামাজ
বা কুরবানীর পর এই দোয়াটি পড়তে পারি:
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ: "রব্বানা-
তাক্বাব্বাল মিন্না-,
ইন্নাকা আনতাছ ছামী‘উল
‘ালীম।" অর্থ: “হে আমাদের
পালনকর্তা! আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।”
৩. নিজে এবং সন্তানের নামাজী হওয়ার
মহা আমল (সূরা ইব্রাহিম: ৪০): যাঁদের সন্তানরা নামাজ পড়তে চায় না, তাঁরা
প্রতি নামাজের পর এই কুদরতপূর্ণ দোয়াটি অবশ্যই পাঠ করবেন:
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
উচ্চারণ: "রব্বিজয়ালনী
মুক্বীমাছ ছলা-তি ওয়া মিন যুররিয়্যতী, রব্বানা- ওয়া তাক্বাব্বাল দু‘আ-ই।" অর্থ: “হে আমার
পালনকর্তা! আমাকে নামাজ কায়েমকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের
প্রতিপালক! আমার দোয়া কবুল করুন।”
৪. নিজের ও নিজের পিতা-মাতার ক্ষমার
জন্য দোয়া (সূরা ইব্রাহিম: ৪১): পিতা-মাতার জন্য এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ
মাগফিরাতের দোয়া আর হতে পারে না:
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
উচ্চারণ: "রব্বানাগফির
লী ওয়ালিওয়া-লিদাইয়্যা ওয়া লিলমু’মিনীনা ইয়াওমা ইয়াক্বূমুল হিসা-ব।" অর্থ: “হে আমাদের
পালনকর্তা! কিয়ামতের দিন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সমস্ত মুমিনদের ক্ষমা করে দিন।”
আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনার
জিন্দেগীতে প্রতি বছর কুরবানী করেছেন। তিনি প্রতি বছর ২ টি করে প্রাণী জবেহ করতেন।
নবীজিকে যদি প্রশ্ন করা হতো, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! ২টি প্রাণী কেন?" জবাব আসতো—"১টি আমার
নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে, আর অন্য ১টি আমার ওই সমস্ত উম্মতের পক্ষ থেকে যারা কুরবানী
করার সামর্থ্য রাখে না।" সুবহানাল্লাহ!
সুনানে ইবনে মাজার হাদীসে হযরত আলী (রা.) ফরমান—"নবী পাক
(সা.) ২টি জানোয়ার জবেহ করতেন, তাই আমিও ২টি জবেহ করি। কারণ হুজুর (সা.) আমাকে অসিয়ত
করেছেন—'আলী, কুরবানী
১টি তোমার নিজের পক্ষ থেকে করবে, আর ১টি আমার পক্ষ থেকে করবে'।"
প্রিয় দর্শক! আপনারা হয়তো শুনেছেন যে, আমাদের
নবীজি (সা.)-এর ঘরে মাসের পর মাস চুলা জ্বলতো না, পেটে পাথর বাঁধতেন, কিন্তু
কুরবানী দেওয়ার সময় ঠিকই উম্মতের ভালোবাসায় ২টি পশু জবেহ করতেন। আবার হযরত আলীও
২টি দিতেন, অথচ
তাঁর নিজস্ব কোনো বিলাসবহুল বাড়িও ছিল না। আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার ব্যাপারে
তাঁদের কোনো কৃপণতাই ছিল না।
আর আমাদের সমাজে আজ কী দেখা যায়? অনেকে
প্রতিদিন দামি মাছ-গোশত ছাড়া ভাত খায় না, কিন্তু কুরবানীর দিন আসলে তারা নানা
অজুহাতে গরীব হয়ে যায়! বলে—"অনেক
টাকা ঋণ, কীভাবে
কুরবানী করব?"
অথচ তারা ঠিকই লোকদেখানো কাজে লাখ লাখ টাকা ওড়াচ্ছে।
প্রিয় দর্শক, পরিশেষে বলা যায়,
হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের পুরো জীবনটাই ছিল পরীক্ষা, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি পরম আনুগত্যের এক জীবন্ত ইতিহাস। তিনি আমাদের
শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি
করতে হয়। আর আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভাবের
দিনগুলোতেও নিজের এবং উম্মতের পক্ষ থেকে প্রতি বছর ২টি করে পশু কোরবানি দিয়ে
উম্মতের প্রতি তাঁর ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
তাই এই কুরবানিতে আমাদের মূল লক্ষ্য যেন কেবল
লোকদেখানো উৎসব বা গোশত খাওয়ার নিয়ত না হয়। আমাদের কোরবানি হোক সম্পূর্ণ হালাল
উপার্জনে, সমস্ত কুসংস্কার বর্জন করে এবং একমাত্র আল্লাহ তাআলার
সন্তুষ্টির জন্য। আসুন, পশুর গলায় ছুরি চালানোর আগে আমরা
আমাদের ভেতরের অহংকার, হিংসা এবং পশুবৃত্তিকে কোরবানি করি।
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই পবিত্র সুন্নাহ ও শক্তিশালী দোয়াগুলো আমরা আমাদের
পরিবার ও সন্তানদের জীবনেও আমল করার চেষ্টা করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহ নিয়তে কোরবানি
করার এবং ইব্রাহিমী আদর্শে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
ইসলামী জ্ঞান ও আমল সংক্রান্ত এই তথ্যবহুল
ভিডিওটি যদি আপনার সামান্যতম উপকারে এসে থাকে, তবে এখনই একটি লাইক
দিয়ে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে দিন। আর আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস ও আমলী
চ্যানেলের সাথে যুক্ত থাকতে চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে পাশে থাকা বেল আইকনটি চেপে
রাখুন। দেখা হবে ইনশাআল্লাহ পরবর্তী কোনো বরকতময় ভিডিওতে। ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ
আমাদের সবাইকে ভালো রাখুন, সুস্থ রাখুন। আসসালামু আলাইকুম
ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
#Hajj206 #কুরবানি #হজ্ব #ওজিফা
কোন মন্তব্য নেই