দুঃখ কষ্টে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলেছেন? জীবনের সব দরজা বন্ধ? অসম্ভবকে সম্ভব করার গোপন দোয়া ও ওজিফা

 

দুঃখ কষ্টে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলেছেন? জীবনের সব দরজা বন্ধ?  অসম্ভবকে সম্ভব করার গোপন দোয়া ও ওজিফা



আপনার জীবনের কি সব দরজাই এক সাথে বন্ধ হয়ে গেছে? কোনো দিক থেকে কোনো আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছেন না? রাতের পর রাত নরম বিছানায় শুয়েও কি অস্থিরতায় চোখের পাতা এক করতে পারছেন না? দুঃখ কষ্ট মসিবতে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলছেন?

একটু থামুন! আজ আপনার সাথে ঘটা এই অগোছালো পরিস্থিতি কিন্তু কোনো দুর্ঘটনাবশত বা কাকতালীয় নয়হতে পারে আজকের এই ভিডিওটি আপনার সামনে আসা এবং আমার এই কথাগুলো শোনা, অলৌকিকভাবে ঠিক করা কোনো বিশেষ ফয়সালারই অংশ!

কারণ, ইতিহাস সাক্ষীযেকোনো অসম্ভব পরিস্থিতিকে মুহূর্তে বদলে দেওয়ার এমন এক গোপন চাবি রয়েছে, যা মানুষের সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর খুলতে শুরু করে! কী সেই রহস্যময় শক্তি? কীভাবে কঠিন বিপদে থাকা মানুষ কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যর্থ হওয়া মরণাপন্ন রোগীও কেবল এক বিশেষ উপায়ে মুক্তি পেয়েছিলেন? বিশেষ করে সে কেমন দোয়া যে দোয়ার বরকতে আল্লাহর অসম্ভবকে সম্ভব করেন, সে কোন ২ রাকাত নামাজ যে ২ রাকাত নামাজে ধারনাতিত জায়গা থেকে সাহায্য নেমে আসে। এই মহামূল্যবান দোয়া ও আমল গুলি আজ বাস্তব প্রমান সহ আপনাদের সামনে তুলে ধরব। পুরা আমলটি বুঝার জন্য প্রতিটি লাইন খুব মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে, অর্ধেক শুনে ভিডিও ছেড়ে চলে গেলে পরে পসতাতে হবে।

আজকের এই পুরো ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলে আপনার জীবনের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং যেকোনো কঠিন সমস্যা সমাধানের পথ চিরতরে বদলে যাবেইনশাআল্লাহ!"

আজকের এই আলোচনাটি শুনে যদি আপনার মনের কোণে একটুও প্রশান্তি জমে, কিংবা মনে হয় কথাগুলো এই মুহূর্তে নিঃসঙ্গতায় ভোগা কোনো এক মানুষের জীবনের দিশা বদলে দিতে পারেতবে অন্তত একটি 'লাইক' দিয়ে আর নিচে কমেন্টে 'আমিন' বা আপনার মনের কথাটুকু লিখে আমাদের এই ভালোবাসার জালে যুক্ত থাকবেন।

কে জানে, আপনার এই একটি ছোট্ট লাইক বা কমেন্টের কারণে হয়তো বার্তাটি এমন কোনো ভাঙা মনের মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে, যে আজ রাতে বালিশ ভিজিয়ে কাঁদছিল আর একটি আলোর আশায় রবের দরবারে হাত তুলেছিল! আপনার একটি ক্লিকই হয়তো হতে পারে কারো জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর উসিলা...।"

মন থেকে করা দোয়ার তাছির বা প্রভাব অপরিসীম। অনেক সময় মানুষের মনে হতে পারে যে জীবনের সব পথ ও দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু রব্বুল করিমের রহমতের দরজা সর্বাবস্থায় খোলা থাকে। আমাদের প্রধান সমস্যা হলো, বিপদে পড়লে আমরা মানুষের দরজায় ধরণা দিই, কিন্তু যিনি আসল সমাধানকারী, তাঁর দরবারে উপস্থিত হই না।

একজন ধনকুবের সাহেবের ঘটনা দিয়ে বিষয়টি সহজে অনুধাবন করা যায়। তাঁর ধন-সম্পদ, বিলাসবহুল গাড়ি ও বাংলোবাড়িসবই ছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁকে দুনিয়াবি নিয়ামতে পরিপূর্ণ করেছিলেন। একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বাচ্চাদের সাথে সময় কাটালেন, রাতের খাবার খেলেন এবং নিজের আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে পড়লেন। ঘরটি ছিল ঠান্ডা এবং বিছানাটি অত্যন্ত নরম, কিন্তু রাতে তাঁর চোখে কোনোভাবেই ঘুম আসছিল না। তিনি এপাশ-ওপাশ করছিলেন। মনে রাখা প্রয়োজন, ঘুমও আল্লাহ তাআলার একটি অনেক বড় নিয়ামত। যাদের ঘুম আসে না, তারাই কেবল এই নিয়ামতের কদর বোঝে।

অনেকক্ষণ বিছানায় ছটফট করার পর তিনি ভাবলেন, "জানি না আজ কেন ঘুম আসছে না! চলুন, বাইরে থেকে একটু ফ্রেশ বাতাস নিয়ে আসি, হয়তো মনটা হালকা হবে আর ঘুম আসবে।" তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে নিজের গাড়ি স্টার্ট করলেন এবং রাস্তার গলিতে ঘুরতে লাগলেন। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একটি খোলা মসজিদ তাঁর নজরে এল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, "এমনিতেই তো ঘুরে বেড়াচ্ছি, একটু মসজিদের ভেতরে যাই। অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিই।"

তিনি মসজিদের বাইরে গাড়ি পার্ক করলেন, সুন্দরভাবে অজু করে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলেন। ভেতরে ঢুকে দেখলেন পুরো মসজিদ শুনশান ও খালি, কিন্তু কোথাও থেকে যেন হালকা হালকা কান্নার আওয়াজ আসছে। তিনি চিন্তা করলেন, রাতের এই নিঝুম প্রহরে মসজিদে কে কাঁদছে? কাছে গিয়ে দেখলেন, মসজিদের এক কোণে এক অত্যন্ত দরিদ্র লোক আল্লাহর বারগাহে হাত তুলে অঝোর ধারায় কাঁদছে এবং আকুতি জানিয়ে বলছে, "হে আল্লাহ! আমার ছোট মেয়েটি ভীষণ অসুস্থ। ডাক্তার জরুরি অপারেশনের কথা বলেছেন। কিন্তু আমার মতো নিঃস্ব গরিবের কাছে তো কোনো টাকা নেই। আমি কোথা থেকে এত টাকা আনব? হে রব্বুল করিম! তুমিই তো সব কিছুর উপায় তৈরি করে দাও। আমার এই করুণ অবস্থার ওপর রহম করো।"

মসজিদে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে সেই ধনী ব্যক্তিটি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলেন, আজ রাতে কেন তাঁর ঘুম আসছিল না! আল্লাহ তাআলা তাঁকে কেন এই নিঝুম রাতে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের করেছিলেন! তিনি মূলত এই অসহায় বান্দার সাহায্যার্থেই প্রেরিত হয়েছেন। তিনি লোকটির কাছে গেলেন, পকেটে থাকা নগদ সব টাকা বের করে তাঁর হাতে তুলে দিলেন এবং বললেন, "ভাই, এই টাকাগুলো নিন এবং আমার বিজনেসের এই কার্ডটি রেখে দিন। ভবিষ্যতে কখনো কোনো প্রয়োজন হলে আমার সাথে নিঃসংকোচে যোগাযোগ করবেন।"

কিন্তু সেই গরিব লোকটি ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাবান। তিনি কার্ডটি বিনীতভাবে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, "আমার কোনো ঠিকানার প্রয়োজন নেই। আমার কাছে স্থায়ী একটি ঠিকানা আছে।" ধনী লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কোন ঠিকানা?" গরিব লোকটি জবাবে বললেন, "এই যে আল্লাহর ঘর! আমি রব্বুল করিমের দরবারে কেঁদেছি, আর তিনি আপনাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যখন আবার কোনো সংকট আসবে, আমি পুনরায় এই দরবারেই চলে আসব। দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আমার করিমের দরজা সর্বদাই খোলা থাকে।"

পাকিস্তানের বিখ্যাত চিকিৎসক ডাক্তার আহমদের ঘটনাটি এ প্রসঙ্গে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন নিজ দেশের সেরা সার্জন। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর আজীবন অবদানের জন্য সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা 'গোল্ড মেডেল' দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজধানী শহরে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি বিমানে উঠলেন। কিন্তু উড্ডয়নের কিছু পরেই আবহাওয়া চরম খারাপ হয়ে যায় এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানটি মাঝপথের এক ছোট বিমানবন্দরে নামতে বাধ্য হয়।

অনুষ্ঠানের সময় পার হয়ে যাচ্ছে দেখে ডাক্তার আহমদ বিমানবন্দর থেকে একটি রেন্ট-এ-কার ভাড়া নিয়ে সড়কপথে রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কিন্তু মাঝপথে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি ও অন্ধকারের কারণে তিনি মূল হাইওয়ে থেকে পথ হারিয়ে এক প্রত্যন্ত গ্রামে ঢুকে পড়েন। দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালিয়ে তিনি ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়েন। হঠাৎ দূরে একটি কুঁড়েঘরে বাল্বের আলো জ্বলতে দেখে তিনি আশ্রয়ের আশায় সেখানে গিয়ে কড়া নাড়েন।

ভেতর থেকে এক বৃদ্ধা মহিলা দরজা খুলে তাঁকে পরম আদরে ভেতরে ডেকে নেন, পানি ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ঘরে ঢুকে ডাক্তার আহমদ দেখলেন পাশে বিছানায় এক ছোট ছেলে শুয়ে আছে। জিজ্ঞেস করতেই বৃদ্ধা চোখের পানি ফেলে বললেন, "বাবা, এটি আমার নাতি। ও খুব জটিল রোগে আক্রান্ত। গ্রামের ডাক্তাররা বলেছেন, আমাদের দেশে নাকি 'ডাক্তার আহমদ' নামে একজন বড় ডাক্তার আছেন, একমাত্র তিনিই এর অপারেশন করতে পারেন। কিন্তু আমি এক দরিদ্র বুড়ি, আমার তো শহরে যাওয়ার বা সেই বড় ডাক্তারকে ফি দেওয়ার সাধ্য নেই! তাই আমি প্রতিদিন নামাজের পর আল্লাহর কাছে দোয়া করিহে আল্লাহ! তুমি আমার এই নাতিকে ডাক্তার আহমদের কাছে পৌঁছে দাও, না হয় ডাক্তার আহমদকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দাও!"

কথাটি শুনে ডাক্তার আহমদ অঝোরে কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, "আম্মা! আল্লাহ আপনার দোয়ার খাতিরে বিমান খারাপ করেছেন, ঝড়-বৃষ্টি দিয়ে আমাকে পথ ভুলিয়েছেন এবং গাড়ি চালিয়ে সোজা আপনার এই কুঁড়েঘরে এনে দাঁড় করিয়েছেন! আমিই সেই ডাক্তার আহমদ।" সুবহানাল্লাহ

আমরা প্রায়শই এমন ভুলে লিপ্ত হই। বিপদে পড়লে প্রথমে ডাক্তার, উকিল, পুলিশ বা অন্যান্য দুনিয়াবি মাধ্যমের পেছনে ছুটি। অবশ্যই মাধ্যমে চেষ্টা করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু মাধ্যমের চেয়ে মাধ্যমগুলোর স্রষ্টা অর্থাৎ 'খালেকে আসবাব'-এর ওপর আগে ভরসা রাখা প্রয়োজন। রোগ হলে নিশ্চয়ই ডাক্তারের কাছে যাবেন, কিন্তু হৃদয়ে প্রথম এই বিশ্বাস লালন করতে হবে যে শিফা দানকারী একমাত্র আল্লাহ। ব্যবসায় ক্ষতি হলে বা পরিবারে সংকট দেখা দিলে আগে রবের দরবারে সিজদানত হতে হবে। সারাদিন দুনিয়ার দরজায় ধাক্কা না খেয়ে যদি ব্যথিত হৃদয়ে, ভাঙা মনে এবং পূর্ণ মনোযোগের সাথে আল্লাহর বারগাহে দুই রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করা হয়, তবে বড় বড় কঠিন সমস্যার অলৌকিক সমাধান হয়ে যায়।

কোরআন মাজিদে, বিশেষ করে সূরা আনবিয়ায়, বহু নবী-রাসূলের সংকটকাল এবং তাঁদের দোয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, আল্লাহর প্রিয় নবীগণ কীভাবে চরম বিপদে কেবল আল্লাহর দিকেই মন ধাবিত করতেন এবং ক্রন্দনরত অবস্থায় মোনাজাত করতেন:

হযরত নূহ (আ.): তিনি সুদীর্ঘ ৯৫০ বছর ধরে নিজের কওমকে এক আল্লাহর দিকে ডেকেছিলেন। এত দীর্ঘ সময়ে মাত্র কমবেশি ৮০ জন মানুষ ঈমান এনেছিলেন। কওমের লোকেরা তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাত, গালিগালাজ করত এবং প্রহার করত। এত বাধা ও কষ্টের পরও তিনি দ্বীনের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি। অবশেষে তিনি যখন আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, আল্লাহ তাআলা মহা প্লাবনের মাধ্যমে অত্যাচারী কাফেরদের ধ্বংস করে দিলেন এবং হযরত নূহ (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের উদ্ধার করলেন। এ ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা হলোসংখ্যার দিকে না তাকিয়ে দ্বীনের কাজে অবিচল থাকা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করা।

হযরত আইয়ুব (আ.): তাঁর জীবনে এসেছিল কঠিন পরীক্ষার ঝড়। তিনি দীর্ঘকাল কঠিন রোগে ভুগেছেন, তাঁর সমস্ত সন্তান ইন্তেকাল করেছিল এবং বিপুল ধন-সম্পদ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেই চরম পরিস্থিতিতেও তিনি দুনিয়ার কারও কাছে অভিযোগ করেননি, বরং আল্লাহর বারগাহে হাত তুলে বলেছিলেন: আন্নি মাছছানিয়াদ্দুররু ওয়া আন্তা আরহামুর রাহিমীন (অর্থ: নিশ্চয়ই আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু)। এটি এমন এক গ্রহণযোগ্য দোয়া, যার বরকতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে পূর্ণ সুস্থতা দান করেছিলেন এবং তাঁর হারানো সমস্ত সম্পদ ও সন্তানাদি দ্বিগুণ হারে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

হযরত জাকারিয়া (আ.): তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সন্তান হওয়া অসম্ভব হলেও তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। তিনি দোয়া করেছিলেন: রব্বি লা তাজারনি ফারদাঁও ওয়া আন্তা খায়রুল ওয়ারিছীন (অর্থ: হে আমার রব! আমাকে একা ছেড়ে দিও না, আর তুমিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ ওয়ারিস)আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করে তাঁকে হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর মতো গুণী পুত্র সন্তান দান করেন এবং তাঁকেও নবুয়তের মর্যাদায় ভূষিত করেন।

হযরত ইউনুস (আ.): তিনি যখন গভীর সমুদ্রের মাঝে প্রকাণ্ড মাছের পেটে বন্দি ছিলেন, সেই অন্ধকার ও শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতিতেও তিনি আল্লাহর ওপরই ভরসা রেখেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন সেই বিখ্যাত দোয়া, যাকে আমরা 'আয়াতে করিমা' বলি: লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ্জালিমীনএটি বিপদ কাটানোর এক মোক্ষম চাবি। এই দোয়ার বরকতে আল্লাহ তাঁকে মাছের পেট থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেন।

আমরা প্রায়ই দুনিয়ার বাহ্যিক উপায়ের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। অথচ মানুষ কখনো একাগ্রচিত্তে সাহায্য করতে পারে না; অনেক সময় মানুষ অন্যের বিপদে আনন্দ পায় বা উপহাস করে। কিন্তু আমাদের প্রতিপালক বান্দার দোষ ঢেকে রাখেন এবং সর্বাবস্থায় নেয়ামত বর্ষণ করেন।

আল্লাহ তাআলা কেবল নেককারদের নন, বরং পরম করুণাময় হিসেবে গুনাহগারদের ডাকও শোনেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এক অত্যাচারী অমুসলিম বাদশাহ শত্রুপক্ষের হাতে বন্দী হওয়ার পর তাকে তামার তৈরি এক বিশাল পাত্রে (ডেগে) পুরে নিচে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ডেগ যখন গরম হয়ে শরীর ঝলসে যাচ্ছিল, তখন সে তার ভুয়া উপাস্যদের ডেকে কোনো সাড়াশব্দ পায়নি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারল এদের কোনো ক্ষমতা নেই। তখন সে পরম আকুতি নিয়ে মুসলমানদের রবকে ডেকে চিৎকার করে বলতে লাগল, "ইয়া আল্লাহ! ইয়া রহমান! আমাকে রক্ষা করো!" এবং 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠ করতে লাগল।

তার এই অকৃত্রিম আকুতি আল্লাহর দরবারে কবুল হলো। মুহূর্তের মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে আগুন নিভিয়ে দিল এবং প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড় এসে রশি ছিঁড়ে সেই ডেগটিকে উড়িয়ে নিয়ে এক অমুসলিম কওমের এলাকায় ফেলে দিল। কওমের লোকেরা উড়ান্ত ডেগ থেকে লোকটিকে বের হতে দেখে অবাক হলো। বাদশাহ তার রক্ষা পাওয়ার অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করতেই পুরো কওমের মানুষ প্রভাবিত হয়ে কালিমাহ পড়ে মুসলমান হয়ে গেল।

৩য় হিজরিতে গাজওয়া-ই-গাতফানের সময় রাসুলুল্লাহ () সাহাবিদের থেকে একটু দূরে গিয়ে একটি গাছের ছায়ায় একাকী বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এই সুযোগে এক কাফের হাতে ধারালো নগ্ন তলোয়ার নিয়ে নিঃশব্দে এসে রাসুল ()-এর সামনে দাঁড়াল এবং অহংকার করে বলল, "হে মোহাম্মদ! এখন বলুন, আমার এই তলোয়ারের হাত থেকে আপনাকে কে বাঁচাবে?"

রাসুলুল্লাহ () বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে কেবল একটি শব্দ উচ্চারণ করলেন: "আল্লাহ!"

এই পবিত্র নামের মধ্য ছিল এমন এক অলৌকিক প্রভাব যে, তা শোনামাত্রই কাফের লোকটি ভয়ে কাঁপতে লাগল এবং তার হাত থেকে তলোয়ারটি মাটিতে পড়ে গেল। রাসুলুল্লাহ () ভূমিতে পড়ে থাকা তলোয়ারটি হাতে নিয়ে বললেন, "এখন বলো, আমার হাত থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে?" লোকটি কেঁদে ফেলে বলল, "আমাকে বাঁচানোর মতো তো কেউ নেই!" রাসুলুল্লাহ () তার অসহায়ত্ব দেখে তাঁকে নিঃশর্ত ক্ষমা করে দিলেন। নবীর এই মহান ক্ষমাশীলতা ও উত্তম চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে লোকটি তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ করল।

এই ঘটনা আমাদের শেখায়শত্রুর মুখোমুখি হলেও বা কঠিন সংকটে পড়লেও সাহস না হারিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা উচিত। একই সাথে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষমা করার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সামান্য কথায় আত্মীয়তা ছিন্ন করা বা প্রতিশোধপরায়ণ হওয়া সুন্নতের পরিপন্থী।

অতীতে আমাদের মায়েরা ও নানী-দাদীরা শিশুদের ঘুম পাড়ানোর সময় কিংবা ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে জিকির, আসমাউল হুসনা ও দরুদ শোনাতেন। ফলে শৈশব থেকেই কোমল মনে দ্বীনি আবহ তৈরি হতো। কিন্তু আধুনিক যুগে শিশুরা মোবাইল, গান-বাজনা ও কার্টুন দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে, যার ফলে তাদের মন থেকে আল্লাহর জিকির ও ভীতি উঠে যাচ্ছে।

আরেকটি বড় ব্যাধি হলো, আমরা বিপদে পড়লে মসজিদে ছুটি, কোরআনখানি বা খতমের আয়োজন করি; কিন্তু সংকট কেটে গেলেই আবার পূর্বের মতো উদাসীন হয়ে যাই এবং নামাজ-মসজিদ থেকে দূরে সরে পড়ি। কোরআনে আল্লাহ এই মনোভাবকে কাফেরদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলোসুখ ও দুঃখ, সর্বাবস্থায় রবের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।

সৈয়দনা আবুল হাসান সিররি সাকতি (রহ.)-এর জীবনের একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে অনুসরণীয়। এক প্রতিবেশী নারী এসে কান্নাকাটি করে বললেন যে তাঁর ছেলেকে বাদশাহর সিপাহীরা ধরে নিয়ে গেছে, তাই তিনি যেন গিয়ে একটু সুপারিশ করেন। হযরত সিররি সাকতি (রহ.) শুনেই জায়নামাজ বিছিয়ে সুন্নতের অনুসরণে দীর্ঘ সালাতুল হাজতের নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। পরম তৃপ্তি ও মনোযোগের সাথে নামাজ শেষ করার পরপরই খবর এল যে তাঁর ছেলে সসম্মানে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। অর্থাৎ, বাহ্যিক দৌড়ঝাঁপ করার আগে সালাতুল হাজত পড়ে রবের সাহায্য চাওয়াই হলো সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর পথ।

অনেক সময় আমরা দীর্ঘকাল ধরে কান্নাকাটি করে দোয়া করার পরও তাৎক্ষণিক ফলাফল দেখতে পাই না। এতে মন নিরাশ হওয়া বা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ার কোনো কারণ নেই।

হাদিস শরিফে এসেছে, যখন কোনো পাপাচারী বা কাফের ব্যক্তি আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের আদেশ দেন, "এর চাওয়া দ্রুত পূরণ করে দাও, কারণ আমি এর বিশ্রী আওয়াজ শুনতে চাই না।" পক্ষান্তরে, যখন কোনো প্রিয় বান্দা চোখের পানি ফেলে রবের দরবারে হাত তোলে, তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, "এখনই এর কাজ কোরো না, একে আরও কাঁদতে দাও, কারণ আমার এই বান্দার আকুতি ও কান্নাকাটি শুনতে বড্ড ভালো লাগছে!"

অভিভাবক যেমন সন্তান জেদ করলেও অসুস্থতার সময় তার ক্ষতির কথা ভেবে শীতল পানীয় বা আইসক্রিম হাতে তুলে দেন না, তেমনই আল্লাহ তাআলাও জানেন তাঁর বান্দার জন্য কখন কোনটা কল্যাণকর। তাই দোয়া কবুল হতে দেরি হলে মন খারাপ না করে এটি ভেবে সন্তুষ্ট থাকা উচিত যে, আমার রবের ইচ্ছাই আমার জন্য সর্বোত্তম।

পরিশেষে, রোগ-শোক, ঋণগ্রস্ততা বাযেকোনো জটিল সংকটে একমাত্র আল্লাহ তাআলাকেই অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ তিনিই সম্মান দানকারী, তিনিই রোগ থেকে আরোগ্য প্রদানকারী এবং তিনিই সকল কষ্টের অবসান ঘটিয়ে অন্তরে প্রশান্তি দানকারী।

"প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আজকের এই পুরো আলোচনা শেষে অন্তরের অন্তস্তল থেকে একটি কথাই বলতে চাইআপনার পরিস্থিতি আজ যেমনই হোক না কেন, জীবনের কোনো বাঁকেই কখনো হতাশ হয়ে রবের রহমত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। মানুষ আপনাকে ফেলে দিতে পারে, দুনিয়া আপনার পথ আটকে দিতে পারে, কিন্তু যে মালিক আপনাকে সৃষ্টি করেছেনতিনি কখনো আপনাকে একা ছেড়ে দেবেন না।

সব দরজা যখন বন্ধ মনে হবে, তখন মনে রাখবেনআপনার সিজদার জায়গাটি কিন্তু এখনো খোলা আছে। আজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সব দুশ্চিন্তা রবের ওপর ছেড়ে দিয়ে, তাঁর দরবারে নিজের মনটা উজাড় করে দিন। যিনি রাতের অন্ধকার শেষে আলো ফোটাতে পারেন, তিনি আপনার জীবনেও আবার সুখের ভোর এনে দেবেনইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব পরিস্থিতিতে একমাত্র তাঁর ওপরই ভরসা রাখার তৌফিক দান করুন, আমাদের সকল পেরেশানি দূর করে দিন এবং অন্তরে প্রশান্তি দান করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।"

কোন মন্তব্য নেই

konradlew থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.