মঙ্গলবার হজ্জের দিন আরাফাতের দিনের আমল। ২১টি দোয়া ও আমল একসাথে

মঙ্গলবার হজ্জের দিন আরাফাতের দিনের আমল। ২১টি দোয়া ও আমল একসাথে



আর মাত্র একদিন পরেই হজ। আরাফাতের ময়দানে একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় পবিত্র হজ। আর এই দিনটি হচ্ছে নয় জিলহজ, ইয়াউমুল আরাফা। প্রত্যেক আরবি হিজরি বছরের শেষ মাসের নবম দিনই হচ্ছে এটি। সারা বিশ্ব থেকে আল্লাহর মেহমানরা আরাফাতের ময়দানে বিশ্ব মুসলিম সম্মেলনে একত্রিত হয়। এদিনে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি মানুষকে নিষ্পাপ করে দেন। এই দিন ও হজ সম্পর্কে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল হাজ্জু আরাফা' অর্থাৎ আরাফাই হলো হজ।

তো নয় জিলহজ দিনব্যাপী মুসলিম উম্মাহর জন্য রয়েছে কিছু করণীয় এবং বিশেষ তাসবিহ ও দোয়া। হজ পালনকারীদের প্রস্তুতিতে নয় জিলহজের করণীয়, তাসবিহ ও দোয়া তুলে ধরা হলো। এবং সাথে সাথে এইদিন যারা হজ করছে না, তারা কী আমল করবেন, কী আমল করলে আপনি আল্লাহর কাছে যা চাইবেন তাই পাবেন, আপনার সকল প্রয়োজন পূরণ হবে, সকল আশা পূরণ হবেআজ তা আলোচনা করব। আশা করি শেষ পর্যন্ত সবগুলি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন।

এদিন হাজিরা তালবিয়ার ধ্বনিতে মুখরিত করে রাখে আরাফাতের মাঠ:

"লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।" অর্থ: আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি উপস্থিত! আপনার ডাকে সাড়া দিতে আমি হাজির। আপনার কোন অংশীদার নেই। নিঃসন্দেহে সব প্রশংসা ও নিয়ামত আপনার এবং একচ্ছত্র আধিপত্য আপনার। আপনার কোন অংশীদার নেই।

নয় জিলহজ সূর্য ওঠার পর তাকবীরে তাশরিক, তালবিয়া, দোয়া এবং তাসবিহ-তাকবীর পড়তে পড়তে আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা হয় হাজিরা। অবশ্যই যোহরের আগে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হয়। হাজীরা সাধ্যমতো আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের কাছাকাছি অবস্থান করে। যোহর ও আসরের নামাজ আরাফাতের ময়দান সংলগ্ন মসজিদে নামিরায় একসঙ্গে জামাতে নির্দিষ্ট শর্ত অনুসারে আদায় করে। মসজিদে নামিরায় অনুষ্ঠিত জামাতে শরিক হতে না পারলে নিজ নিজ তাঁবুতে যথাসময়ে যোহর এবং আসর নামাজ পড়ে নেয়। আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকালীন সময়ে তওবা, ইস্তেগফার, তাসবিহ, তাহলীল, তাকবীর ও দোয়ার মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করে। কেননা আরাফাতের ময়দানের দোয়া আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি কবুল হয়। হজের খুতবা মনোযোগ সহকারে শুনে সূর্য ডোবা পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন।

তবে কেউ যদি সূর্য ডোবার আগে আরাফাতের ময়দান থেকে বের হয়ে যায়, তবে তার কর্তব্য হলো তিনি পুনরায় আরাফাতের ময়দানে ফিরে আসবেন এবং সূর্য ডোবার পর আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করবেন। ফিরে না আসলে ওই ব্যক্তির জন্য 'দম' বা কোরবানি আবশ্যক হয়ে যায়। আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ে বেশি বেশি তওবা, ইস্তেগফার এবং দোয়া করেন। সূর্য ডোবার পরে মাগরিব না পড়ে মুজদালিফার উদ্দেশ্যে তালবিয়া পড়তে পড়তে আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করে। আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করার সময় মুজদালিফায় না পৌঁছে রাস্তায় মাগরিবের নামাজ পড়া যাবে না। মুজদালিফায় পৌঁছে এক আজান এবং আলাদা আলাদা একামতে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করে। যদি কেউ আরাফাতের ময়দান কিংবা পথে মাগরিবের নামাজ আদায় করে, তবে ওই ব্যক্তির জন্য মুজদালিফায় গিয়ে পুনরায় মাগরিব নামাজ আদায় করা ওয়াজিব।

এদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো দোয়াগুলো পড়া যেতে পারে। এই দোয়া যারা হাজী না তারাও আমল করবেন। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রা.)-এর কাছে যখন হজের মাস আসত, তিনি এত বেশি চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতেন, মনে হতো তিনি কোন কিছুকে কাবু করতে চাচ্ছেন কিন্তু কাবু করতে পারছেন না। সকাল-সন্ধ্যায় বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করতেন। সাহাবায়ে কেরাম হজের মাসে বাজারে গেলেও বড় বড় করে তাকবীর পড়তেন:

"আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।"

তাছাড়া আপনি হজে যেতে পারেননি, তবুও কয়েক মিনিটে হজের সওয়াব আপনি লাভ করতে পারেন। মিশকাত শরীফের ২৩১২ নং হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

·         যে ব্যক্তি সকালে এবং বিকালে ১০০ বার করে 'সুবহানাল্লাহ' পড়বে, সে তার মত হবে সওয়াবের দিক দিয়ে যে ১০০ বার হজ করবে।

·         আর যে ব্যক্তি সকালে এবং বিকালে ১০০ বার 'আলহামদুলিল্লাহ' পড়বে, সে আল্লাহর পথে ১০০ ঘোড়া ও ১০০ মুজাহিদ রওয়ানা করে দেয়া ব্যক্তির মত হবে।

·         আর যে সকালে-বিকালে ১০০ বার 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়বে, সে বনী ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশের ১০০ লোক আজাদ করে দেয়া ব্যক্তির সমতুল্য হবে।

·         আর যে ব্যক্তি সকালে এবং বিকালে ১০০ বার 'আল্লাহু আকবার' পড়বে, সেদিন তার চেয়ে বেশি সওয়াবের কাজ আর কেউ করতে পারবে না।

তাছাড়া এদিন আরো কিছু মাসনুন দোয়া পড়তে পারেন:

·         সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।

·         আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফি দ্বীনি ওয়া দুনইয়ায়া ওয়া আহলি ওয়া মালি।

এগুলো সব হাদিস শরীফের মাসনুন দোয়া। এগুলো অত্যন্ত বরকতময় কিছু দোয়া। এই দোয়াগুলো বেশি বেশি আরাফাতের দিন পড়বেন। বাংলা উচ্চারণগুলো নিচে শুদ্ধ করে দেওয়া হলো, আপনারা দরকার হলে স্ক্রিনশট নিয়ে নিবেন:

১) আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দ্বালায়িদ দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।

২) আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল বুখলি, ওয়া আউযু বিকা মিনাল জুবনি, ওয়া আউযু বিকা মিন ফিতনাতিদ দুনিয়া ওয়া আযাবিল ক্ববর।

৩) আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন জাওয়ালি নিমাতিক, ওয়াতাহাউলি আফিয়াতিক, ওয়াফাজাআতি নিকমাতিক, ওয়াজামিঈ সাখাতিক,

৪) রব্বি আয়িন্নি ওয়া লা তুয়িন আলাইয়্যা, ওয়ানসুরনি ওয়া লা তানসুর আলাইয়্যা,  ওয়াহদিনি ওয়া ইয়াসসিরিল হুদা লি।

৫) আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন জাহদিল বালা, ওয়া দারকিশ শাকা, ওয়া সুয়িল ক্বাদা, ওয়া শামাতাতিল আ'দা।

আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন জাহদিল বালা, ওয়া দারকিশ শাকা, ওয়া সুয়িল ক্বাদা, ওয়া শামাতাতিল আ'দা।

৬) ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, ছাব্বিত কালবি আলা দ্বীনিক।

৭) আল্লাহুম্মা মুসাররিফাল কুলুব, সাররিফ কুলুবানা আলা ত্বাআতিক।

৮) ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, ছাব্বিত কালবি আলা দ্বীনিক।

৯) আল্লাহুম্মা মুসাররিফাল কুলুব, সাররিফ কুলুবানা আলা ত্বাআতিক।

১০) আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি

১১) আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুকা ওয়াল আফাফা ওয়াল গিনা।

১২) আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাক্বতানি ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়া'দিকা মাসতাত্বা'তু, আউযু বিকা মিন শাররি মা সানা'তু, আবু'উ লাকা বিনি'মাতিকা আলাইয়্যা ওয়া আবু'উ বিযাম্বি ফাগফিরলী ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনুবা ইল্লা আনতা। (সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার)

১৩) সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।

১৪) সুবহানাল্লাহ (৩৩ বার), আলহামদুলিল্লাহ (৩৩ বার), আল্লাহু আকবার (৩৪ বার)।

১৫) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর। (একবার)

১৬) সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযীম।

১৭) আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনী বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।

১৮) ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম, বিরহমাতিকা আসতাগীস।

১৯) লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনাজ জালিমীন।

২০) আসতাগফিরুল্লাহাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম ওয়া আতূবু ইলাইহি।

২১) আল্লাহুম্মা আদখিলনিল জান্নাতা ওয়া আজিরনি মিনান নার

আল্লাহুম্মা আদখিলনিল জান্নাতা ওয়া আজিরনি মিনান নার

কোরআন ও হাদিসে উল্লেখিত অন্যান্য দোয়া ও জিকির, তাসবিহ-তাহলীলসহ বেশি বেশি এস্তেগফার করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা মুমিন উম্মাহকে নয় জিলহজ হজের দিন কাজগুলো যথাযথ পালন করার তৌফিক দান করুন। হজ্জে মাবরুর দান করুন। হজ পালনকারী সবাইকে নিষ্পাপ হিসেবে কবুল করুন। হাজীদের উসিলায় আমাকে এবং আপনাদেরকেও কবুল করুন। আমিন।

 


কোন মন্তব্য নেই

konradlew থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.