দুনিয়া বড় স্বার্থপর তোমার জন্য কেউ থামবে না
দুনিয়ার স্বার্থপরতা ও হারামের পরিণতি
এই পৃথিবীতে আপনার জন্য কেউ থেমে থাকবে না—সূর্য, চন্দ্র, আলো-বাতাস কিংবা রোদ-বৃষ্টি, কেউই না। এমনকি একটি মানুষও আপনার জন্য অপেক্ষা করবে না। এই পৃথিবী বড় স্বার্থপর। তাই আমি প্রবীণ ও তরুণ—উভয় প্রজন্মকেই উদ্দেশ্য করে বলছি, আপনি যদি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলেন, তবে মনে রাখবেন, আপনার জন্য কেউ থেমে থাকবে না।
হে অভিভাবকগণ, স্ত্রী-সন্তানের সুখের জন্য যদি আপনি হারাম উপার্জনের পেছনে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে থাকেন, তবে মনে রাখবেন, এর কোনো সুফল আপনি আখেরাতে পাবেন না। সুদের টাকা, কিস্তির টাকা, হারামের উপার্জন, ওজনে কম দেওয়া কিংবা ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু শয়তান আপনার অন্তরে এই কুচিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছে যে—পরিবার ও সন্তান-সন্ততির জন্য আপনাকে এগুলো করতে হবে। আল্লাহর কসম! এই পরিবারের কেউ আপনার এই অবদানের কথা মনে রাখবে না। তারা কোনোদিন আপনার এই ত্যাগের কথা স্বীকার করবে না।
হয়তো দুপুরে কিংবা আসরের পর আপনার জানাজা অনুষ্ঠিত হলো। আপনার মেয়ে, ছেলে, নাতি-নাতনি ও স্ত্রী দুই-চার ঘণ্টা কান্নাকাটি করল। কিন্তু সেই দিনই এশার নামাজের পর দেখা যাবে, প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে রান্না করে আনা খাবার তারা সবাই মিলে খুব তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে। মাছ, মাংস, ডাল—সবই তারা খাচ্ছে। অথচ কিছু সময় আগেই তারা আপনার জন্য কত কেঁদেছিল! তাই নিজের কবর ও আখেরাত বরবাদ করে, নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে হারাম খাওয়ানো কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না।
সন্তান ও পরিবারের দ্বীনি দায়িত্ব
আমার সন্তান যদি এক ওয়াক্ত ফজরের নামাজও না পড়ে, তবে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সন্তানের জন্য আমি কেন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করব? এমন সন্তানের সাথে তো প্রথমেই হিসাব-নিকাশ চুকানো দরকার। তাকে জিজ্ঞেস করা উচিত, "তুমি ঈমানদারের সন্তান হয়েও কেন নামাজ পড়ছ না?" যদি সে প্রকৃত মুসলমানের সন্তান হয়, তবেই তার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করা সার্থক। আমার কষ্টের উপার্জনে কেনা ফ্যান, খাট, পালঙ্ক, সোফা ও আসবাবপত্র ব্যবহার করে, আমার টাকায় খাওয়া-দাওয়া করে সে যদি সারারাত মোবাইলে অশ্লীল দৃশ্য দেখে আর ফজরের নামাজ ত্যাগ করে, তবে এমন পশুর মতো আচরণের জন্য পরিশ্রম করার কোনো মানে হয় না। যার কপালে আল্লাহর জন্য কোনো সেজদা নেই, তাকে তো প্রকৃত মানুষ বলা যায় না।
নামাজ নষ্ট করার তাফসীর ও বেনামাজির হুকুম
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ তারাই, যারা নামাজ নষ্ট করে। প্রতিটি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কারা? যারা নিজেদের নামাজকে অবহেলা ও নষ্ট করে দেয়। তাফসীরে এর তিনটি অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে:
১. যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে, কিন্তু সবসময় বিলম্ব করে এবং যথাসময়ে আদায় করে না। ২. যে নামাজ পড়ে, কিন্তু নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, রুকু, সেজদা ও তাসবিহগুলো ঠিকমতো আদায় করে না। ৩. যে নামাজ পড়ে, কিন্তু অলসতাবশত জামাত ত্যাগ করে অর্থাৎ জামাতের সাথে নামাজ আদায় করে না।
এই শ্রেণীর মানুষদের নামাজ নষ্টকারী ও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। তাহলে ভাবুন, যে ব্যক্তি একেবারেই নামাজ পড়ে না, তার স্থান কোথায়? তার তো কোনো মর্যাদাই নেই। বেনামাজির কোনো প্রকৃত পরিচয় হতে পারে না, তাকে প্রকৃত মানুষের কাতারেও ফেলা যায় না। সে চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। পশুর চেয়ে উপরে ওঠার কোনো যোগ্যতা তার নেই; গরু, ছাগল কিংবা কুকুর-বিড়ালের চেয়েও তার মর্যাদা নিচে।
অভিভাবক ও যুবকদের প্রতি আহ্বান
তাই তরুণ সমাজ এবং উপস্থিত অভিভাবকবৃন্দ—আপনাদের সবারই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা দরকার। আপনারা সন্তানদের বৈষয়িক চাহিদা পূরণ করছেন, তাদের খাওয়াচ্ছেন, পরাচ্ছেন; কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় পাওনাটি দিচ্ছেন তো? প্রতিটি সন্তানের প্রতি বাবার, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর এবং কন্যাসন্তানের প্রতি পিতা-মাতার প্রধান চাওয়া হওয়া উচিত—নামাজ, সেজদা, পর্দা এবং আখেরাত।
কারণ আমরা মুসলমান, আমরা বেইমান কিংবা কেবল দুনিয়াদার নই; আমাদের মূল গন্তব্য হলো আখেরাত। আমরা যদি আখেরাতকে ভুলে যাই, তবে তা মনে রাখবে কে? অন্য ধর্মের অনুসারীরা তো এই সত্য বোঝে না। আল্লাহ কোরআনে বারবার বলেছেন যে, তারা স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ আমাদের ঈমান দিয়েছেন, নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন, আসমানি কিতাব দিয়েছেন এবং যুগে যুগে সঠিক পথ দেখানোর জন্য ওলামায়ে কেরাম পাঠিয়েছেন। এরপরও আমরা কেন পথ হারাব?
হে যুবক ভাইয়েরা, তোমরা কিসের অভাবে নামাজের গুরুত্ব বুঝছ না? তোমরা কি আল্লাহকে চেনোনি, নাকি রাসূলের নাম শোনোনি? কোনো আলেমের আলোচনা কি তোমাদের কানে পৌঁছায়নি, নাকি তোমরা কখনো পবিত্র কোরআন ও মসজিদ দেখোনি? কিসের অভাবে তোমরা আজ পথভ্রষ্ট হলে? যারা নামাজ পড়ছ না, তাদের কি আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানোর মতো কোনো যুক্তি আছে?
নাকি তোমরা বলবে যে, তোমরা এমন কোনো মরুভূমি, পাহাড়ের গভীর কিংবা সাগরের তলদেশে ছিলে যেখানে কোনো আযান পৌঁছায়নি বা আল্লাহর পরিচয় জানা যায়নি? চারপাশে এত মসজিদ, মাদ্রাসা, আলেম এবং আযানের ধ্বনি থাকার পরও যারা দিনের পর দিন নামাজ ত্যাগ করছ, তারা আল্লাহর সামনে কী जवाब দেবে? কীভাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর শাফায়াত বা সুপারিশ লাভ করবে?
ঈমানদার ও কাফেরের পার্থক্য এবং অহংকার
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঈমানদার ও কাফেরের মধ্যকার পার্থক্যের মূল ভিত্তি হিসেবে নামাজকে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, "আমাদের এবং মুশরিক ও কাফেরদের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো নামাজ।" যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে নামাজ ছেড়ে দিল, সে কুফরি করল। অতএব, সেজদাকারীরা কখনো বোকা বা নির্বোধ নয়।
শয়তান আজ তরুণদের চুল ও বাহ্যিক ফ্যাশনের পেছনে এমনভাবে লেলিয়ে দিয়েছে যে, তারা সারাদিন চুলের স্টাইল পরিবর্তন এবং সেলুনে শত শত টাকা খরচ করতেই ব্যস্ত থাকে। মনে রাখবেন, চুলের অতিরিক্ত রূপচর্চা ও ফ্যাশন নিয়ে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকা মূলত নারীদের স্বভাব। নারীর সৌন্দর্য চুলে, তাই তারা চুলের যত্ন নেয়। কিন্তু একজন পুরুষ যখন পুরুষত্ব হারিয়ে নারীদের মতো চুলের ফ্যাশন নিয়ে মেতে থাকে, তখন সে মূলত নিজের কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব করে।
মানুষের দায়িত্ব ও নফসের দাসত্ব
হে প্রিয় যুবক ও কিশোর ভাইয়েরা, নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না। এই পৃথিবীতে পশুর বাচ্চার কোনো অভিভাবক লাগে না, তারা নিজের মতো চললেও বড় হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের সন্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। মানুষের সন্তানকে ঈমান, ইসলাম, উত্তম আখলাক, আদব-কায়দা এবং সঠিক আচরণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হয়। তার কবর ও আখেরাত সুন্দর করার দায়িত্ব পরিবারের। এই কারণেই মহান আল্লাহ মানুষকে অভিভাবকহীন করে দুনিয়ায় পাঠাননি; বরং মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, ভাই-বোন ও আত্মীয়-সংক্রান্ত এক বিশাল অভিভাবকত্ব দান করেছেন, যেন সে সুন্দর চরিত্র নিয়ে জীবন গড়তে পারে।
অথচ দুঃখের বিষয়, আজ অনেকে নিজের খামখেয়ালিপনাকে স্বাধীনতা মনে করে। আল্লাহর হুকুম, রাসূলের सुন্নাহ কিংবা কোরআনের বিধানকে তোয়াক্কা না করে নিজের মনগড়া জীবনযাপন করে। পোশাকের বিকৃত ফ্যাশন, চলাফেরার অপসংস্কৃতি এবং যত্রতত্র দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার মতো অশোভন আচরণ কোনো মুমিনের জীবনে থাকতে পারে না। যে ব্যক্তি নিজের খেয়ালখুশি মতো চলে, সে মূলত ইবলিশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে।
ইবলিশের প্রধান অপরাধ ছিল অহংকার। যখন সে আল্লাহর সামনে নিজের অহংকার প্রকাশ করল, আল্লাহ তাকে অভিশপ্ত করে দরবার থেকে তাড়িয়ে দিলেন। আজ কোনো যুবককে ভালো কথা বলতে গেলে সে উল্টো প্রশ্ন করে, "আপনার সমস্যা কী?" আসলে সমস্যা আমার নয়, সমস্যা তার নিজের। এই অশ্লীলতা, বেনামাজি জীবন এবং পাপাচার তাকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একজন আলেম হিসেবে আমরা তো কেবল তাকে সেই আগুন থেকে বাঁচাতে চাই। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "আমি আমার উম্মতের কোমর জড়িয়ে ধরে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে চাই।"
'গাই' নামক দোজখের গর্ত ও তওবার সুসংবাদ
মহান আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে বলেছেন, যারা নামাজ নষ্ট করে এবং নিজেদের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তারা অত্যন্ত নিকৃষ্ট প্রজন্ম। আল্লাহ তাদের জাহান্নামের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নিকৃষ্ট গর্ত 'গাই'-এ নিক্ষেপ করবেন। তাফসীরে এসেছে, এই গর্তটি এতটাই ভয়াবহ যে স্বয়ং জাহান্নামও প্রতিদিন এই গর্তের আজাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে।
তবে আল্লাহ তায়ালা আশার বাণীও শুনিয়েছেন। যে বান্দা আন্তরিকভাবে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে, ঈমান আনবে এবং সৎ কর্ম করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। অতীতের গুনাহের জন্য তাকে লজ্জিত করা হবে না। তাই আসুন, আমরা সবাই পাপের পথ ছেড়ে মহান আল্লাহর দিকে এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাহর দিকে ফিরে আসি।

কোন মন্তব্য নেই